নয়াকৃষি এলাকায় কৃষকদের মাটির অবস্থা
উবিনীগ || Monday 06 July 2026 ||
উবিনীগ ১৭তম কর্মী উন্নতি সভার তৃতীয় দিনে “মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা” শিরোনামে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনে মাটি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ সভায় আরশিনগর বিদ্যাঘর, ঈশ্বরদী, নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি, কুষ্টিয়া, রিদয়পুর বিদ্যাঘর, টাঙ্গাইল, নোনাবাড়ি বিদ্যাঘর বদরখালী, কক্সবাজার, এবং শ্যামলী ঢাকা কার্যালয়ের কর্মী এবং নয়াকৃষি আন্দোলনের কৃষক, তাদের সাথে নিয়ে আসা মাটি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা মাটির ধরণ, বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ ও সেই মাটিতে কি কি ফসল উৎপাদন হয় তার বর্ণনা দেন।
মাটি হচ্ছে কৃষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মাটিতে বীজ গজায়, গাছ-পালা ফসল জন্মায়। মাটি খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, বায়ু, এবং পানি দ্বারা গঠিত। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় মাটি সৃষ্টি হয়েছে।
মাটির অবস্থা নিয়ে নয়াকৃষি কর্মী এবং নয়াকৃষির কৃষকরা এমন সময় আলোচনা করছেন, যখন সারা বাংলাদেশের অন্যান্য কৃষকরা অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে ব্যাপক মাটির ধরণ বিবেচনায় না নিয়ে রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং হার্বিসাইড ব্যবহারের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে ব্যস্ত । আধুনিক কৃষির কৃষকরা জমিতে রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশের কৃষি জমির উৎপাদনশীলতা বহুলাংশে হারিয়েছে, সকল জীব-অণুজীব, প্রাণবৈচিত্র্য, মাটি, পানিসহ পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে।
অপরদিকে নয়াকৃষির কৃষকরা প্রাণবৈচিত্র্য নির্ভর কৃষি চর্চা করছেন। মাটির স্বাস্থ্য ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তারা মিশ্র ফসলের চাষ, ফসল অদল-বদল করে চাষাবাদ করছেন। তারা কোন রূপ রাসায়নিক ব্যবহার না করে নিজেদের স্থানীয় জাতের বীজ, জৈব সারবস্তু এবং কম্পোষ্ট দিয়ে ফসল উৎপাদন করছেন। এ রকম অবস্থায় নয়াকৃষির কৃষকদের জমির মাটির অবস্থা কেমন, জানা এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য এ আলোচনা।
সকল কেন্দ্র থেকে নিয়ে আসা মাটির নমূনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা টেবিলে দেখানো হলো:
|
মাটির ধরণ |
মাটির উৎস |
আলোচনাকারী |
মাটির বর্ণনা |
কেন্দ্রে এলাকার নাম |
|
এঁটেল মাটি |
ইরি ধানের নীচু জমি |
নয়াকৃষি কৃষক ছানোয়ারা |
খুব শক্ত মাটি, ইরি ধানের নিচু জমির মাটি। এ মাটিতে ধান ভাল হয় তবে, কোনো সবজি ভাল হয় না। |
আরশিনগর বিদ্যাঘর |
|
বেলে দোআশ |
কৃষি জমি |
নয়াকৃষি কৃষক ছানোয়ারা |
এঁটেল মাটির তুলনায় একটু নরম যা হাতে নিয়ে মুঠ পাকানো হলে তা ভেঙ্গে যায়। এ মাটিতে কম বেশী সব ফসল ভালো হয়। |
আরশিনগর বিদ্যাঘর |
|
দোআঁশ |
কৃষি জমি |
নয়াকৃষির কৃষক ছানোয়ারা |
এ মাটি নরম। এই মাটিতে সব রকমের ফসল হয়। বিশেষ করে শাক সবজির ফলন ভালো হয়। |
আরশিনগর বিদ্যাঘর |
|
এটেল-পলি মাটি |
সাতোল বিলের |
আজমিরা খাতুন |
এ মাটিতে স্থানীয় প্রায় ১৮ জাতের আমন ধান চাষ হয়। ধান কেটে নেয়ার পর ন্যারা থেকে যায় এবং যখন চলন বিলের পানি আসে তখন পলি জমা করে। পানি নেমে গেলে মসুর, গম, পেয়াজ ও রসুন চাষ করা হয়। |
নাটোর অঞ্চলের মাটি |
|
দোআঁশ মাটি |
|
আজমিরা খাতুন |
এই মাটিতে সবজি ভালো হয়। টমেটো, বেগুন, লাউ এবং শীত মৌসুমের ফসল বেশি হয়। এ মাটিতে সবজি ভাল হয় |
নাটোর অঞ্চলের মাটি |
|
|
|
|
|
|
|
দোঁয়াশ |
বাড়ির পাশের জমির |
নয়াকৃষির কৃষক মনিরুজ্জামান |
এ মাটিতে শাক সবজি ভালো হয়। বিশেষ করে রসুন ও পেয়াজ ভালো হয়। |
নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি, কুষ্টিয়া |
|
পলি মাটি |
শিলাইদহ এলাকার |
নয়াকৃষির কৃষক মনিরুজ্জামান |
মাটিতে বাদাম, সরিষা, মটর, গম, ছোলা, ইত্যাদি ফসল হয়। |
নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি, কুষ্টিয়া |
|
বেঁলে দোঁআশ |
চর এলাকার মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক মনিরুজ্জামান |
মাটিতে মাসকলাই, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়া, গম, কালিজিরা, তিসি ইত্যাদি ফসল হয়। |
নবপ্রাণ আখড়াবাড়ি, কুষ্টিয়া |
|
দোআশ-১ |
বাড়ির পাশের মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক হুসনে আরা |
এই মাটিতে শাক সবজি ভালো হয় |
কুমারখালি (মির্জাপুর), কুষ্টিয়া |
|
দোআশ-২ |
অন্য জমির দোআঁশ মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক হুসনে আরা |
পেয়াজ, রসুন, মসুর ইত্যাদি ফসল ভালো হয়। |
কুমারখালি (মির্জাপুর), কুষ্টিয়া |
|
এঁটেল |
তথ্য নাই |
নয়াকৃষির কৃষক হুসনে আরা |
এই মাটিতে প্রায় সব ধরনের ধান চাষ ভালো হয় |
কুমারখালি (মির্জাপুর), কুষ্টিয়া |
|
দোঁআশ |
তথ্য নাই |
নয়াকৃষির কৃষক মনোয়ারা বেগম |
এ মাটিতে পিয়াজ, রসুন, সরিষা, তিল, কালিজিরা ফসল হয়। কিন্তু এ মাটিতে কোনো ধানের আবাদ ভালো না। |
কুমারখালি (মির্জাপুর), কুষ্টিয়া |
|
বেলে দোঁআশ |
বাড়ির পাশের মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক মনোয়ারা বেগম |
এই মাটিতে আলু, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, কচু এবং শাক ও সবজি ভালো হয়। |
কুমারখালি (মির্জাপুর), কুষ্টিয়া |
|
|
|
|
|
|
|
বেলে দোঁআশ |
ধলেশ্বরী নদীর পাশের মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক আলিম |
এ মাটিতে মূলা, সবজি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন ভালো হয়। এ মাটিতে ধানের আবাদ ভালো হয় না। |
রিদয়পুর বিদ্যাঘর, টাঙ্গাইল |
|
পলি- দোঁআশ |
তথ্য নাই |
নয়াকৃষির কৃষক আলিম |
এ মাটিতে সকল ফসল হয়। তবে বিশেষ ভাবে এ মাটিতে বাদামের ফলন ভালো হয়। এছাড়া গম, পায়রা, চিনা ও মসলা জাতীয় ফসল ভালো হয়। |
রিদয়পুর বিদ্যাঘর, টাঙ্গাইল |
|
এঁটেল |
তথ্য নাই |
নয়াকৃষির কৃষক আলিম |
এঁটেল মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি। এই মাটিতে ধান বেশি হয়। |
রিদয়পুর বিদ্যাঘর টাঙ্গাইল |
|
|
|
|
|
|
|
দোঁআশ |
সনাতনী চরের মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক আনছার |
মাটিতে কাউন, বাদাম, ও মিষ্টি আলু ভালো হয়। বিশেষ করে ডাল জাতীয় ফসল ভালো হয়। |
সনাতনী চর, সিরাজগঞ্জ |
|
এঁটেল মাটি |
সনাতনী চরের মাটি |
নয়াকৃষির কৃষক আনছার |
এই মাটিতে ধান, পাট ভালো হয়। |
সনাতনী চর, সিরাজগঞ্জ |
|
|
|
|
|
|
|
এঁটেল মাটি |
বদরখালী |
মমতাজ |
এঁটেল মাটি ফসলের জমির মাটি। এই মাটিতে শুধু ধান হয় আর কোনো ফসল হয় না। |
নোনাবাড়ি বিদ্যাঘর, বদরখালী, কক্সবাজার |
|
এঁটেল পলি মাটি |
বদরখালী |
মমতাজ |
এঁটেল পলি মাটি বাড়ির পাশের মাটি। মাটিতে কাঁদা মাটি মিশ্রিত থাকে। এ মাটিতে কিছু লবণাক্ততা রয়েছে। এ মাটিতে সবজি হয় যেমন, চিচিঙা, মূলা, ঢেঁড়স, লাল শাক, মূলা শাক ইত্যাদি। |
নোনাবাড়ি বিদ্যাঘর, বদরখালী, কক্সবাজার |
|
কাঁদা মাটি |
বদরখালী |
মমতাজ |
কাঁদা মাটি ফসলের মাটি। এ মাটি লবণাক্ত হবার কারণে ভালো মাটি ও জৈব সার ব্যবহার করে তারপর এ মাটিতে ফসলের আবাদ করা হয়। এ মাটিতে সবজি চাষ হয়। |
নোনাবাড়ি বিদ্যাঘর, বদরখালী, কক্সবাজার |
|
পলি মাটি |
বদরখালী |
মমতাজ |
পলি মাটি প্যারাবন এলাকার মাটি। এ মাটি লবণাক্ত। এ মাটি লবাণাক্ত হওয়ায় কোনো ফসল হয় না। এ মাটিতে শুধু প্যারাবন আর একপ্রকার ঘাস হয়, উলুখড়। |
নোনাবাড়ি বিদ্যাঘর, বদরখালী, কক্সবাজার |
|
|
|
|
|
|
|
বালি মাটি |
তুরাগ নদীর মাটি |
জাহাঙ্গীর আলম জনি |
এ মাটিতে কাশফুল ছাড়া আর কিছু হয় না। এ মাটির রং কালো এবং দূষিত হওয়ায় অনেক দুর্গন্ধ। |
ঢাকা |
|
|
|
|
|
|
আরশিনগর বিদ্যাঘর, ঈশ্বরদী এলাকা পদ্মা নদীর পলি বাহিত সমতল ভূমি হলেও এ অঞ্চল খরা প্রবণ অঞ্চল। এ অঞ্চলের মাটির ধরণ দোঁআশ, এঁটেল, বেলে দোআঁশ। এ অঞ্চলে প্রায় সব রকম ফসলই উৎপাদন হয়ে থাকে তার মধ্যে প্রধানত ধান, গম, সরিষা, পাট সবজির মধ্যে শিম, ঢেড়শ, বেগুন (শীত ও গ্রীষ্মকালীন), কাঁচামরিচ, করলা, চালকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, গাজর ইত্যাদি।
নয়াকৃষি কৃষক ছানোয়ারা বেগম মাটি সম্পর্কে তার বাস্তব অভিজ্ঞার মাধ্যমে এঁটেল মাটি ও দোআশ মাটির বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। বেলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কম হবার কারণে এ মাটিতে শাক, ডাটা, সবজি এবং শিকড় জাতীয় ফসল ভাল হয়। দোআঁশ মাটিতে পানি ও মাটির পুষ্টি সুষম ভাবে থাকে ফলে প্রায় সব ধরণের ফসলই ভাল হয়ে থাকে। দোআঁশ মাটিতে বিশেষ করে আলু পেয়াজ, বেগুন, কাঁচামরিচ, টমেটো, লাউ, শসা, করলা, মসুর ,মুগ, ছোলা, সরিষা ভাল হয়। ধানও হয় যদি পানি থাকে। মাটি সম্পর্কে তার উপস্থাপনা থেকে নয়াকৃষির মাটি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করেন তার প্রমাণ মেলে। কেননা, তিনি যে ভাবে এঁটেল ও দোআঁশ মাটির বর্ণনা দিয়েছেন সেটাই উল্লেখিত মাটির ধরণ।

অপর দিকে নাটোর জেলার বরাইগ্রাম উপজেলার সাতোল বিলের তলার মাটি সম্পর্কে বলা হয়েছে এ মাটি এঁটেল মাটি। এঁটেল মাটির বৈশিষ্ট্য হলো এ মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা খুব বেশি। শুকিয়ে গেলে খুবই শক্ত এবং ভেজা অবস্থায় আঠালো হয়। এ মাটিতে খনিজ উপাদান বেশি থাকে। ধান যেহেতু পানি বেশি পছন্দ করে সে কারণে এঁটেল মাটিতে ধান উৎপাদন ভাল হয়।
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলা এলাকা বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আবস্থিত । এ এলাকাটিও পদ্মা ও তার শাখা নদীর পলিবাহিত সমতল ভূমি। এখান মাটি প্রধানত দোআঁশ। বিল এলাকার মাটি এঁটেল এবং চরের মাটি বেলে দোঁআশ। এ এলাকার ধানসহ সকল ধরণের সবজি ফসল উৎপাদন হয়। এলাকার থেকে নয়াকৃষির কৃষকগণ দোআঁশ মাটি, পলিমাটি, বেলে দোআঁশ মাটি ও এঁটেল মাটির নমূনা দেখিয়ে নিজস্ব বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আলোচনা করেছেন। দোঁআশ ও পলি মাটিতে প্রায় সকল ধরণের ফসল ভাল হয়ে থাকে। দোআঁশ ও পলি মাটতে ফসল ভাল হবার কারণ হচ্ছে—পলিমাটির পানি ধারণ ক্ষমতা যেমন বেশি ঠিক তেমনি অতিরিক্ত পানি বের করে দিতেও পারে। আবার পলিমাটিতে জৈবপদার্থ ও খনিজ উপাদান বেশি থাকে ফলে ফসল ভাল জন্মে। অপর দিকে দোআঁশ মাটিতে পানি ও জৈব উপাদান সুষম থাকে সে কারণে ফসল ভাল হয়। কুমারখালী এলাকার নয়াকৃষির কৃষকগণ নয়াকৃষির মাটি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করেন বলেই তাদের নিয়ে আসা মাটির বর্ণনা ঠিক মত দিয়েছেন।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলাসহ পুরো টাঙ্গাইল জেলা বন্যাপ্রবন এবং যমুনা নদী ও তার শাখা নদীর পলি বাহিত সমতল ভূমি। এখানকার মাটি প্রধানত দোআশ ও পলি মাটি। ধান সব মৌসুমেই হয়, এছাড়া পাট ও সরিষা প্রধান ফসল। শাক সবজির মধ্যে রয়েছে লাউ, লাল শাক, ডাটা, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, পালংশাক, শিম ঢেড়শ, ফুলকপি, বাঁধাকপি।
এখানকার নয়াকৃষির কৃষকরা তিন ধরণের মাটির নমূনা দেখিয়ে আলোচনা করেন। সেসব হচ্ছে, ধলেশ্বরী নদীর পাশের বেলে মাটি, পলিদোআঁশ মাটি এবং এঁটেল মাটি। বেলে দোআঁশ মাটিতে মূল জাতীয় ফসল ভাল হয়। সেদিক থেকে নয়াকৃষির কৃষক বেলে মাটিতে মূল জাতীয় ফসল যেমন-মুলা, আলু, পেয়াজ, রসুনের কথা বলেছেন। পলি দোআঁশ মাটিতে গম, পায়রা, চিনা ও বাদামের কথা বলেছেন। পলি মাটিতে জৈব ও খনিজ উপাদান থাকার কারণে দানাশস্য এবং বাদাম এর কথা বলেছেন। আর এঁটেল মাটিতে ধান ভাল হবার কারণ পানি ধারণ ক্ষমতা বেশি, খনিজ উপাদান বেশি মাত্রায় থাকে। আর অর্ধ জলজ উদ্ভিদ হবার কারণে অনুকূল পরিবেশ পাবার কারণে ভাল হয়।
সনাতনী চরটি সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর উপজেলায় অবস্থিত। এ চরটি যমুনা নদীর একটি চর। এখানকার নয়াকৃষির কৃষক আনসার আলী বলেন, এই চরে দুই ধরণের মাটি রয়েছে। বেলে দোআশ ও এঁটেল মাটি। চরের মাটি প্রতিবছর নদীর পানিতে প্লাবিত হবার কারণে এ মাটিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব ও খনিজ উপাদান যুক্ত হয়। সে কারণে এখানকার মাটিতে উৎপাদিত ফসল ভাল জন্মে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে এ চরে কোন উফশী বা হাইব্রিড জাতের ফসল উৎপাদন করা যায় না। এখানকার বেলে দোআঁশ মাটিতে কাউন, বাদাম, মিষ্টি আলু ভাল হয়। বিশেষ করে ডাল ফসল ভাল হয়। এসব ছাড়াও সেখানে পটল, বেগুন, ঢেড়শ ভাল উৎপাদন হয়। এঁটেল মাটিতে স্থানীয় জাতের ধান ও পাট ভাল হয়।
এখানকার নয়াকৃষির কৃষকদের ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে মাটির পুষ্টি ব্যবস্থাপনা করার জন্য আলাদা করে কোন জৈব উপাদান বা কম্পোষ্ট ব্যবহার করার প্রয়োজন পরে না। এ ছাড়া প্রতি বছর যমুনা নদীর পানিতে প্লাবিত হয়। এমনকি ফসল উৎপাদনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জমি প্রস্তুত করারও প্রয়োজন পরে না। যার কারণে এখানকার কৃষকদের ফসল উৎপাদন খরচ খুবই কম। ফসল উৎপাদনের জন্য তারা শুধুমাত্র ফসলের বীজ ছিটিয়ে দেন আর ফসল তোলার সময় হলে তুলে আনেন।
কক্সবাজারের চকিরয়া উপজেলার বদরখালী কেন্দ্র বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল। এ এলাকাটিতে চকরিয়া সুন্দরবন ছিল, বর্তমানে সেটা নেই। বদরখালীর পূর্ব থেকে দক্ষিণ পশ্চিম দিক দিয়ে মাতামহুরী নদী প্রবাহিত হয়ে বঙ্গপোসাগরে মিলিত হয়েছে। এই নদীতে নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হয়ে থাকে। বদরখালীর চার ধরণের মাটির নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যথা-এঁটেল মাটি, এঁটেল পলি মাটি, কাঁদা মাটি, এবং পলিমাটি। এখানকার মাটিতে লবনাক্ততা থাকে যার কারণে স্বাভাবিক ভাবে ফসল উৎপাদন করা কষ্টকর। এখানকার মাটিতে লবন সহনশীল ধান এবং কিছু সবজি উৎপাদন হয়। বর্তমানে বদরখালীর কৃষকরা নয়াকৃষির মাটি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করে বাড়ির পাশে থাকা জমিতে জৈবসার ব্যবহার করে সবজি উৎপাদনের করছেন।
ঢাকার তুরাগ নদীতে উপর্যপুরি শিল্প বর্জ্য, ট্যানারির বর্জ্য, যন্ত্রচালিত নৌযানের পরিত্যাক্ত তৈল, বিভিন্ন কারখানার বর্জ মিশ্রণের কারণে তুরাগ নদীর পানি মারাত্মক দূষিত। তুরাগের পানি দূষিত হবার কারণে এর মাটিও দূষিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, নয়াকৃষি কৃষকরা মাটির ধরণ আনুসারে ফসল উৎপাদন করেন। মাটির ধরণ অনুসরণ করে ফসল উৎপাদন করেন। ভাল ফসল উৎপাদন করার জন্য মাটির পরিচর্যা করেন। আপরদিকে আধুনিক কৃষির কৃষকদের দেখি তার মাটির ধরন বাচবিচার না করেই অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য উপর্যপুরি রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করেন। তারা স্মরণই করেন-না, মাটি প্রধান শক্তি জৈব উপাদান। মাটিতে জৈব উপাদান না থাকলে যত রাসায়নিক উপাদানই দেয়া হোক না কেন ফসল উপাদন ভাল হবে না। ফসল গাছ হলেও নানা রকম রোগ এবং পোকার আক্রমণ ব্যপক বেড়ে যাবে। বাস্তবে সেটাই ঘটছে। যার কারণে আধুনিক কৃষকরা তাদের ফসলে ব্যাপক কীটনাশক ব্যবহার করছেন। মাটির প্রতি গুরুত্বই দেন না। ইতিমধ্যে সরকার তথ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশে মাটিতে জৈব উপাদান ১% এর নিচে চলে এসেছে। ভাল ফসল উৎপাদনের জন্য নূন্য পক্ষে মাটিতে ৩% জৈব উপাদান থাকা আবশ্যক। সেদিক থেকে নয়াকৃষি কৃষকদের জমির মাটি ফসল উৎপাদনের দিক থেকে ভাল অবস্থায় রয়েছে। তারা যদি নয়াকৃষির মাটি ব্যবস্থাপনার চর্চা ধরে রাখেন তাহলে পর্যায়ক্রমে মাটির স্বাস্থ্য আরো ভাল হবে। ভাল ফসল উৎপাদন করতে হলে মাটির স্বাস্থ্যের প্রতি অবশ্যই গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।
প্রতিবেদক: কামরুল হাসান নিলয় এবং গোলাম রাব্বী বাদল